জেলার ইতিহাস

নেত্রকোনা জেলা বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলের ময়মনসিংহ বিভাগের একটি প্রশাসনিক এলাকা।এটি বাংলাদেশের একটি উর্বর ও সমৃদ্ধ এলাকা।প্রধান ফসলাদির মধ্যে ধানের ব্যাপক ফলন হয়। এছাড়া মৌসুমী শাক সবজিরও ভাল ফলন হয়। মাছ চাষ এ অঞ্চলের একটি অর্থনৈতিক চালিকা শক্তি।এটি বাংলাদেশের একটি “এ” শ্রেণীভুক্ত জেলা।[২] এখানে রয়েছে সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়, পাহাড়ি জলপ্রপাত, চীনা মাটির পাহাড়, টিলা, হাওড়, নদী, খাল এবং অসংখ্য ছোট-বড় বিল। ধান,গম, পাট, সরিষা, কলা,কুমড়া, কমলা ইত্যাদি কৃষি পণ্য এই অঞ্চলের অন্যতম অর্থনৈতিক পণ্য হলেও বিভিন্ন ছোট শিল্প এবং খনিজ সম্পদের প্রাচুর্য রয়েছে এই জেলায়। কাঁচ বালি, সিলেকশন বালি, কয়লা, কেউলিন (চীনা মাটি) এবং পাথর এই জেলায় পাওয়া যায়। সুনেত্র গ্যাস ক্ষেত্রের উল্লেখযোগ্য অংশ নেত্রকোনা জেলায় অবস্থিত।

ইতিহাস

খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে এ অঞ্চল গুপ্ত সম্রাটগণের অধীন ছিল। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, গুপ্তযুগে সমুদ্রগুপ্তের অধীন এই অঞ্চলসহ উত্তর-পশ্চিম ময়মনসিংহ অঞ্চল কামরূপ রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে হিন্দুরাজ শশাঙ্কের আমন্ত্রণে চৈনিক পরিব্রাজক হিউ এন সাঙ যখন কামরূপ অঞ্চলে আসেন, তখন পর্যন্ত নারায়ণ বংশীয় ব্রাহ্মণ কুমার ভাস্কর বর্মণ কর্তৃক কামরূপ রাজ্য পরিচালিত ছিল। খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগে পূর্ব ময়মনসিংহের উত্তরাংশে পাহার মুল্লুকে বৈশ্য গারো ও দুর্গা গারো তাদের মনগড়া রাজত্ব পরিচালনা করতো। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ দিকে জনৈক মুসলিম শাসক পূর্ব ময়মনসিংহ অঞ্চল আক্রমণ করে অল্প কিছুদিনের জন্য মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। চতুর্দশ শতাব্দীতে জিতারা নামক একজন সন্ন্যাসী কামরূপের তৎকালীন রাজধানী ভাটী অঞ্চল আক্রমণ ও দখল করেন। সে সময় পর্যন্তও মুসলিম শাসক ও অধিবাসী স্থায়ীভাবে অত্রাঞ্চলে অবস্থান ও শাসন করতে পারেনি। খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে আলাউদ্দিন হোসেন শাহের শাসনামলে (১৪৯৩-১৫১৯) সমগ্র ময়মনসিংহ অঞ্চল মুসলিম রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত হয়।

আলাউদ্দিন হোসেন শাহ’র পুত্র নসরৎ শাহ’র শাসনামলে (১৫১৯-১৫৩২) দু’একবার বিদ্রোহ সংঘটিত হলেও বিদ্রোহীরা সফল হয়নি। সমগ্র ময়মনসিংহ অঞ্চলেই নসরৎ শাহ’র শাসন বলবৎ ছিল। নসরৎ শাহ-র উত্তরাধিকারীরা (১৫৩৩-১৮৩৮) কিংবা তার পরবর্তী লক্ষ্মণাবতীর অন্য শাসকেরা ময়মনসিংহ অঞ্চলের উপর আধিপত্য বজায় রাখতে পারেনি। ময়মনসিংহের উত্তরাংশ কোচদের পুনরাধীন হয়ে পড়ে। বাকী অংশ দিল্লীর পাঠান সুলতান শেরশাহ-র (১৫৩৯-১৫৪৫) শাসনভুক্ত হয়েছিল। তৎপুত্র সেলিম শাহ’র শাসনের সময়টি (১৫৪৫-১৫৫৩) ছিল বিদ্রোহ ও অস্থিরতায় পূর্ণ। রাজধানী দিল্লী থেকে অনেক দূরে ও কেন্দ্রীয় রাজশক্তির দূর্বলতার সুযোগে প্রধান রাজস্ব সচিব দেওয়ান সুলায়মান খাঁ (যিনি পূর্বে কালিদাস গজদানী নামে পরিচিত ছিলেন) সম্রাটের বিরুদ্ধাচরণ করেন। এতে করে দেশী ও বিদেশী রাজ্যলিপ্সুরা এতদঞ্চল দখলের প্রয়াস পায়। এর মধ্যে ভাটী অঞ্চল (পূর্ব-উত্তরাংশ) সোলায়মান খাঁ-র দখলভুক্ত ছিল। কেন্দ্রীয় শাসকের প্রেরিত সৈন্যদের হাতে সোলায়মান খাঁ নিহত হলেও তার দু’পুত্রের মধ্যে জ্যেষ্ঠ পুত্র ঈশা খাঁ খিজিরপুর থেকে ভাটী অঞ্চলে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। ১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে ঈশা খাঁ’র মৃত্যুর পর তৎপুত্র মুসা খাঁ ও আফগান সেনা খাজা উসমান খাঁ কর্তৃক অত্রাঞ্চল শাসিত ছিল। সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে (১৬০৫-১৬২৭) সমগ্র ময়মনসিংহ অঞ্চল মোঘল সাম্রাজ্যভুক্ত হয়।[৩][৪]

ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৮০ খিস্টাব্দে হওয়া নেত্রকোণা মহকুমাকে ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জানুয়ারি নেত্রকোণা জেলা করা হয়।

অবস্থান ও আয়তন

এই জেলার উত্তরে উত্তরে ভারতের মেঘালয়, দক্ষিণে কিশোরগঞ্জ জেলা, পূর্বে সুনামগঞ্জ জেলা, পশ্চিমে ময়মনসিংহ জেলা

প্রশাসনিক এলাকাসমূহ

নেত্রকোণা জেলা ১০টি উপজেলা, ১০ টি থানা, ৫টি পৌরসভা, ৮৬টি ইউনিয়ন, ১৯৬৭টি মৌজা, ২২৯৯টি গ্রাম ও ৫টি সংসদীয় আসন নিয়ে গঠিত।

উপজেলাসমূহ

নেত্রকোণা জেলায় মোট ১০টি উপজেলা রয়েছে। উপজেলাগুলো হল:

ক্রম নংউপজেলাআয়তন[৫]
(বর্গ কিলোমিটারে)
প্রশাসনিক থানাআওতাধীন এলাকাসমূহ
০১আটপাড়া১৯২.৫১আটপাড়াইউনিয়ন (৭টি): স্বরমুশিয়াশুনইলুনেশ্বরবানিয়াজানতেলিগাতীদুওজ এবং সুখারী
০২কলমাকান্দা৩৭৬.২২কলমাকান্দাইউনিয়ন (৮টি): কলমাকান্দানাজিরপুরপোগলাবড়খাপনলেঙ্গুরাখারনৈকৈলাটি এবং রংছাতি
০৩কেন্দুয়া৩০৩.৬০কেন্দুয়াপৌরসভা (১টি): কেন্দুয়া
ইউনিয়ন (১৩টি): আশুজিয়াদলপাগড়াডোবাগণ্ডাসান্দিকোণামাসকাবলাইশিমুলনওপাড়াকান্দিউড়াচিরাংরোয়াইলবাড়ী আমতলাপাইকুড়া এবং মোজাফরপুর
০৪খালিয়াজুড়ি২৯৭.৬৩খালিয়াজুড়িইউনিয়ন (৬টি): মেন্দিপুরচাকুয়াখালিয়াজুড়িনগরকৃষ্ণপুর এবং গাজীপুর
০৫দুর্গাপুর২৭৯.২৮দুর্গাপুরপৌরসভা (১টি): দুর্গাপুর
ইউনিয়ন (৭টি): কুল্লাগড়াদুর্গাপুরচণ্ডিগড়বিরিশিরিবাকলজোরাকাকৈরগড়া এবং গাঁওকান্দিয়া
০৬নেত্রকোণা সদর৩৪১.৭১নেত্রকোণা সদরপৌরসভা (১টি): নেত্রকোণা
ইউনিয়ন (১২টি): মৌগাতিমেদনীঠাকুরাকোণাসিংহের বাংলাআমতলালক্ষ্মীগঞ্জকাইলাটিদক্ষিণ বিশিউরাচল্লিশারৌহাকালিয়ারা গাবরাগাতি এবং মদনপুর
০৭পূর্বধলা৩০৮.০৪পূর্বধলাইউনিয়ন (১১টি): হোগলাঘাগড়াজারিয়াধলা মূলগাঁওপূর্বধলাআগিয়াবিশকাকুনীখলিশাউড়নারান্দিয়াগোহালাকান্দা এবং বৈরাটি
০৮বারহাট্টা২২০বারহাট্টাইউনিয়ন (৭টি): বাউসীসাহতাবারহাট্টাআসমাচিরামসিংধা এবং রায়পুর
০৯মদন২৩৩.৩০মদনপৌরসভা (১টি): মদন
ইউনিয়ন (৮টি): কাইটাইলচানগাঁওমদনগোবিন্দশ্রীমাঘানতিয়শ্রীনায়েকপুর এবং ফতেপুর
১০মোহনগঞ্জ২৪১.৯৯মোহনগঞ্জপৌরসভা (১টি): মোহনগঞ্জ
ইউনিয়ন (৭টি): বড়কাশিয়া বিরামপুরবড়তলী বানিহারীতেতুলিয়ামাঘান সিয়াদারসমাজ সহিলদেওসুয়াইর এবং গাগলাজুর

সংসদীয় আসন

সংসদীয় আসনজাতীয় নির্বাচনী এলাকা[৬]সংসদ সদস্য[৭][৮][৯][১০][১১]রাজনৈতিক দল
১৫৭ নেত্রকোণা-১দুর্গাপুর উপজেলা এবং কলমাকান্দা উপজেলাশূণ্য
১৫৮ নেত্রকোণা-২নেত্রকোণা সদর উপজেলা এবং বারহাট্টা উপজেলাশূণ্য
১৫৯ নেত্রকোণা-৩আটপাড়া উপজেলা এবং কেন্দুয়া উপজেলাশূণ্য
১৬০ নেত্রকোণা-৪মদন উপজেলাখালিয়াজুড়ি উপজেলা এবং মোহনগঞ্জ উপজেলাশূণ্য
১৬১ নেত্রকোণা-৫পূর্বধলা উপজেলাশূণ্য

শিক্ষা

তৎকালীন শেখ হা‌সিনা(বর্তমা‌নে নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়) বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণধীন ভবন

অতীতে শিক্ষার হার কম থাকলেও দিনেদিনে এই হার ক্রমশ বাড়তেছে।শিক্ষার হার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড় হার ৬৬.১৩%। নেত্রকোণা জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় ১ টি, মেডিকেল কলেজ ১ টি, কলেজ ২৯ টি, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ২৩৬ টি, প্রাথমিক বিদ্যালয় ১০৮৩ টি, মাদ্রাসা ১৬০টি রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়

নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়।

হাফেজ জিয়াউর রহমান ডিগ্রি কলেজ

মেডিকেল কলেজ

কাশবন বিদ্যানিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়,বারহাট্টা

অন্যান্য

নেত্রকোণা সরকারী মহিলা কলেজ
  • নেত্রকোণা সরকারি কলেজ,
  • নেত্রকোণা সরকারি মহিলা কলেজ
  • হাফেজ জিয়াউর রহমান ডিগ্রি কলেজ, শ্যামগঞ্জ।
  • মদন সরকারি কলেজ
  • কেন্দুয়া সরকারি কলেজ
  • সরকারি হাজী আব্দুল আজিজ খান কলেজ,
  • আবু আব্বাস ডিগ্রি কলেজ,
  • হেনা ইসলাম কলেজ,
  • নেত্রকোণা সিটি কলেজ,
  • মোহনগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজ,
  • পূর্বধলা সরকারি কলেজ।
  • ফকির আশরাফ কলেজ,
  • কলমাকান্দা সরকারি ডিগ্রি কলেজ,
  • সুসং সরকারি কলেজ।
  • চন্দ্রনাথ ডিগ্রি কলেজ
  • তেলিগাতী সরকারী কলেজ
  • সরকারী কৃষ্ণপুর হাজী আলী আকবর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ
  • মোহনগঞ্জ মহিলা কলেজ
  • বারহাট্টা সরকারি কলেজ
  • মনসুর আহমেদ মহিলা কলেজ, বারহাট্টা
  • আটপাড়া ডিগ্রী কলেজ।
  • আদর্শ নগর কলেজ।
  • আবু তাহের খান কলেজ
  • চুঁচুঁয়া পাবলিক কলেজ
  • নেত্রকোনা সরকা‌রি বা‌লিকা উচ্চ বিদ‌্যালয়

* আঞ্জুমান আদর্শ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়

বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব

হুমায়ুন আহমেদ

নির্মলেন্দু গুণ

কবি হেলাল হাফিজ

জাফর ইকবাল

কুদ্দুস বয়াতি

লুৎফুজ্জামান বাবর (সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী)

শৈলজারঞ্জন মজুমদার

মূল নিবন্ধ: নেত্রকোণা জেলার ব্যক্তিবর্গের তালিকা

বৈচিত্রময় খাদ্যাভ্যাস

শুটকি, চ্যাপা, কবাক, গরুর মাংসের শুটকি, বালিশ মিষ্টি, দামড়া পিঠা ইত্যাদি।

চিত্তাকর্ষক স্থান

চিত্রশালা

  • বিরিশিরি, দুর্গাপুর, নেত্রকোণা
  • হাজং মাতা রাশমণির ভাস্কর্য
  • গাছের পাথুরে শাখা
  • শিলীভূত গাছের নিকটচিত্র
  • রিকশা, নেত্রকোণায়
  • মদন পৌরসভাতে মগড়া নদীর দৃশ্য
  • সোমেশ্বরী নদী
  • গ্রামের রাস্তা
  • দিগন্ত
  • পুটিয়া কাটা খাল, নেত্রকোণা সদর
  • রাঙ্গামাটি খাল ও হরিখালি খালের মিলনস্থল, মালনি, নেত্রকোণা সদর
  • বিরিশিরি ব্রীজ হতে সুমেশ্বরী নদী, দূর্গাপুর
  • সুসং দূর্গাপুরের জমিদারির নায়েবের এর ব্যবহৃত সর্বশেষ চেয়ার
  • ঠাকুরাকোণা রেলওয়ে ব্রীজ